বুধবার । ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১২ই ফাল্গুন, ১৪৩২

নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা

ড. রাজিয়া খাতুন

১২ ফেব্রুয়ারি অভাবনীয় সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হলো কাক্সিক্ষত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গোটা একটি প্রজন্ম এর আগে ভোট দিতে পারেনি। ফলে ভোটাধিকার বঞ্চিত মানুষ একটি ভালো নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে।

প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরে তাদের উচ্ছ্বাস ছিল বাঁধভাঙা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে পাওয়া জনমত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সুযোগ। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। জামায়াতে ইসলামী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংসদীয় আসনে জয়ী হয়েছে, যা রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ গড়েছে। নির্বাচনে এনসিপি’র কয়েকজন তরুণ প্রতিনিধির জয়লাভ নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে আধিপত্যে রূপান্তর না করে বরং জাতীয় ঐক্যকে কাঠামোগত অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। পূর্বে দেড় দশকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সরকারকে দুর্নীতি ও ফ্যাসিস্টে পরিণত করেছিল। সংসদে একাধিপত্য রাষ্ট্র পরিচালনা সহজ করলেও এর ঝুঁকিও কম নয়। অনেক ক্ষেত্রেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা দেয়। বিএনপি এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে বলে আশা করি। ঐক্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে আধুনিকায়ন সফল হয়, কিন্তু বিভাজন থাকলে এই ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া হবে এজন্য সর্বাগ্রে-

১. বেপরোয়া নেতা-কর্মীদের উপর দ্রুত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
২. মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত ক্লিন ইমেজের সৎ ও নির্লোভ নেতাদের বাছাই।
৩. সবার নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত করা হয়।
৪. সংকট উত্তরণে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ ও আলোচনার দরজা সব সময় খোলা রাখা।
৫. পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের খুনি লুটেরাদের বিচার ত্বরান্বিত করা।
৬. শহিদ হাদী হত্যার সুবিচার নিশ্চিত করা।
৭. নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা।
৮. সরকারি কর্মচারীদের পে-স্কেল ইস্যুটি নিষ্পত্তি করা।
৯. দ্রুততম সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত করা।
১০. স্থায়িত্ব ও উন্নয়ন কাজের জন্য যথাসম্ভব বিরোধী শক্তি অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা।
১১. প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিচার ব্যবস্থা দলীয় প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।
১২. মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

একজন শিক্ষক হিসেবে প্রত্যাশা থাকবে- বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বাজেট বৃদ্ধি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব ও লাইব্রেরি সুবিধা, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম, ক্যাম্পাসে সহিংসতা ও সেশনজট মুক্ত পরিবেশ; আমরা চাইনা কোনো শিক্ষক লাঞ্ছিত হোক। আমরা চাই না কোনো শিক্ষক নিজেকে দলীয় পণ্য বানিয়ে ফেলুক। জ্ঞানভিত্তিক, গবেষণা নির্ভর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ, যেখানে শিক্ষা হবে উন্নয়নের মূল তালিকা শক্তি।

যদি রাষ্ট্র কেবল শাসকদলের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে নাগরিকদের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত বাংলাদেশ চাই। যেখানে মানসম্মত শিক্ষা, প্রশ্নপত্র ফাঁসমুক্ত পরীক্ষা ও সেশনজটমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। আমরা চাই সময়মতো নতুন বই। আমরা চাইনা, না পড়ে অটোপাশ করতে। কোটা নয়, যেন মেধার ভিত্তিতে চাকরির দাবিতে এত ছাত্রের, এত মানুষের প্রাণ গেল, আমরা চাই তাদের এই আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়। নতুন করে যেন কোনো বৈষম্য বা কোটার জন্ম না হয়। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা পাঠে মন দিয়ে মেধাবী হয়ে উঠুক। শিক্ষিত বেকারত্ব দূর করতে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। প্রযুক্তি নির্ভর উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।সকল সেক্টরে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিভিন্ন মৌলিক সেবা খুব সহজে হাতের মুঠোয় পাওয়া যায়।

আমরা চাই চাঁদাবাজি, ঘুস, দুর্নীতি চিরতরে বন্ধ হোক। চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হতে চায় না, আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক, দেশে দালাল মুক্ত, কমিশন মুক্ত, উন্নত চিকিৎসা সেবা চাই। চাই অসম্প্রদায়িক দেশ। এক সম্প্রীতির বাংলাদেশ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যেখানে আছে, থাকবে। একটি সাম্যের বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে আইনশৃঙ্খলা সবার জন্য সমান হবে। সর্বোপরি একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে উঠবে এই প্রত্যাশা থাকবে। নিরাপদ সমাজ, নারী নিরাপত্তা ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন